Feeds:
পোস্ট
মন্তব্য

কাটাকুটি-০৪

আজ বিকালে মিরপুর বাঁধের উপর গিয়েছিলাম। ঈদের দিন চারিদিকে মানুষের বন্যা। এর মধ্যে কপাল জোরে কীভাবে যেন একটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে গিয়েছিলাম। সাঁতার পারি না চারজনের কেউই তবু নৌকায় সানন্দে উঠে পড়লাম চারজনই। প্রথমে ঠিক হয়েছিলো আধা ঘন্টা ঘুরবো আমরা। সে হিসাবে আমার দায়িত্ব ছিলো পনেরো মিনিট যাওয়ার পর মাঝিকে নৌকা ঘোরাতে বলা।

আমরা যাচ্ছিলাম; অনেক জল, অনেক কচুরিপানার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু জলের নিঃস্তব্ধতাকে ভাঙ্গেনি কেউ; শুধু জলের মধ্যে বইঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। পনের মিনিট কেটে গেলো, আমরা নিশ্চুপ। আমাদের সামনেই জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির কিছু বিদ্যুতের টাওয়ার, চার পা ছড়ানো। নৌকা ক্রমশ সেগুলির ভিতর দিয়ে যেতে থাকলো। অনেকটা সময় কেটে গেল বহু বছরের জমে থাকা সব চিন্তায়। আকাশে অনেক মেঘ, আসন্ন ঝড়ের প্রস্তুতিতে অস্বাভাবিক মৌন হয়ে আছে চারপাশ।

নৌকা চলে আসলো টাওয়ারের একদম নিচে। মাথা উঁচু করে দেখতে পেলাম একদম চূড়াটাকে। নৌকা আস্তে আস্তে এগিয়ে চলছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত কোন এক ভূখণ্ডের দিকে। যতই এগুচ্ছি, দ্রিম-দ্রিম ঢাকের শব্দের মিইয়ে যাওয়া স্বর কানে এসে লাগছে। শৈশব মনটা আবার চঞ্চল হয়ে উঠলো, “কীসের শব্দ ?” আবার কোথায় যেন হারিয়ে গেল শব্দটা !

বুঝতে পারছি চেতনার স্পষ্ট সীমারেখাগুলি কেউ যেন সযত্নে মুছে দিচ্ছে। লাল আর নীলের মাঝে কালোর সেই স্পষ্ট দাগটা যেন জলের স্রোতে ধুয়ে যাচ্ছে। মগজের মধ্যে সবকিছু মিলে মিশে একাকার। এখন আর মনে হচ্ছে না আমি মিরপুরে বাঁধের উপর, একটু দূরেই আশুলিয়া। স্মৃতির মধ্যে তালগোল পাঁকিয়ে আমি এখন পৌছে গেছি মহেশখালি। দূরের ওই গ্রাম এখন আর বিরুলিয়া না, বরং কুতুবদিয়া কি সোনাদিয়া।

দূরে সরে যাচ্ছে নৌকা, মুছে যাচ্ছে স্মৃতি। ক্রমশ স্মৃতিহীন এক মানুষ হয়ে যাচ্ছি আমি। চমৎকার !

অস্পৃশ্য কাল

মাঝে মাঝে প্রতারক হয়ে উঠে সময়। নিষিদ্ধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে আমাদের সবকিছুকে কঠিন করে তোলে। জীবনের তরঙ্গময়তার সুষমত্ব বলে কিছুই কখনো থাকে না। নিস্তরঙ্গ কালের অলস সময়টুকুর পর আমাদের জন্য বাঁচিয়ে রাখে যাবতীয় ঝঞ্ঝাকে। একের পর এক আঘাতে যখন আমরা রক্তাক্ত হই, হাতজোড় করে ভিক্ষা করি নিঃশ্বাস নেবার অবসরটুকু, তখনো সে থামে না। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়, যখন অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণকেই নিয়তি মেনে নেই, তখন যেন একটু অবসর মিলে। একটু বিশ্রামের পরই আবার ঢুকে পরি চিরন্তন লুপের মধ্যে। কন্সট্রাকশন, ডেস্ট্রাকশন… কন্সট্রাকশন, ডেস্ট্রাকশন…কন্সট্রাকশন, ডেস্ট্রাকশন…কন্সট্রাকশন, ডেস্ট্রাকশন…কন্সট্রাকশন, ডেস্ট্রাকশন…কন্সট্রাকশন, ডেস্ট্রাকশন…কন্সট্রাকশন, ডেস্ট্রাকশন…কন্সট্রাকশন, ডেস্ট্রাকশন… এভাবেই এগিয়ে চলি অনিশ্চিত অন্ধকার সরণী ধরে।

যেভাবে আছি এই দেশে

০১

যাচ্ছে। চাই বা না চাই সময় ঠিকই কেটে যাচ্ছে। মহাবিশ্বের এনট্রপি বাড়ছে, বাড়ছে আমাদের বয়স আর কমছে পৃথিবীতে থাকার জায়গা।

প্রতিবছরই রমজানের সময়টাতে রীতিমত নরক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয় দুপুর কিংবা বিকালে। তবু এবার যেন কেউ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এই ভাগাড়ে আমরা কত বীভৎসভাবে বেঁচে আছি। পেটের দায়ে ছাত্র পড়াতে হয় মোহাম্মদপুরে। রোজকার ভরসা বারো নম্বর বাস ( অধুনা ছত্রিশ )। চেষ্টা করি আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে। তিনটার ধারে কাছে বেজে গেলেই সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পাই ঢাকা শহর কি বস্তু ! গতকালকের কথাই ধরা যাক।

বেলা সাড়ে তিনটার দিকে যখন কাওরান বাজার সার্ক ফোয়ারার মোড়ে বাসের জন্য দাঁড়ানো, চারপাশে তখন জনসমুদ্র বললেও কম বলা হবে। দুই-তিনজন পুলিশ সার্জেন্ট আর ট্রাফিক পুলিশ সতর্কভাবে দাঁড়ানো, যাতে কোন বাসই এখানে না থামতে পারে, কোন লোকজন উঠা নামা না করতে পারে। কাজ অবশ্যই প্রশংসনীয় – যত্রতত্র বাস দাঁড়ানো যে যানজটের মূল কারণের একটি তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দাঁড়াবোই বা কোথায় ? বাংলামোটর বাস থামা নিষেধ, কাওরান বাজার বাস থামা নিষেধ। শাহবাগের পর একমাত্র ফার্মগেট। এই বিশাল রাস্তার মাঝে যারা আছেন তাঁরা কী করবেন তা কেউ জানে না।

অবশ্য পুলিশ সার্জেন্ট অতোটা নির্দয় নন। বাস থামতে দেন, তবে কাওরানবাজারের মোড় থেকে অনেকখানি সামনে। বাস থামতে না থামতেই, হাত দিয়ে ইশারা করেন বাস টান দিতে, কখনো বা লাঠি নিয়ে তাড়া করেন। এর ফলাফল কাল হাতেনাতেই দেখলাম। একলোক বাসে উঠতে যাচ্ছেন, এমন  সময় পুলিশ বাস ধাওয়া দেওয়া মাত্র বাস সজোরে টান মারলো। ভদ্রলোক নিশ্চিতভাবেই দুর্দান্ত রকমের পুণ্যবান, নচেৎ উনার হ্যাঁচরপ্যাঁচর করে বাসে উঠার বদলে সরাসরি উপরে পার্সেল হয়ে যাওয়ার কথা।

এর সমাধাম কী হবে তা ভেবে পাই না। ঢাকায় এত লোক, এরকম না করলে পুলিশের পক্ষে জ্যাম সামলানো মুশকিল – আবার আমার মত যারা ব্রাত্য, লোকাল পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করেন তাঁদের নাভিশ্বাস উঠে যায় এরকম দৌড়ের উপর রাখলে। জরুরী ভিত্তিতে ঢাকা থেকে লাখ পঞ্চাশেক লোক ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া ছাড়া উপায় দেখছি না।

০২

আজকাল রাস্তাঘাটে কিংবা ব্লগে আলোচনার হট-টপিক আই সি এল আর ক্রিকেটাররা। সবাই ন্যায় অন্যায়, উচিত অনুচিত আর নিমক হালাল আর হারাম নিয়েই ব্যস্ত। সবাই বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েই খালাস। কিন্তু কেউ একটু তলিয়ে ভাবে না। যেই রাজ্জাককে নিয়ে আমরা খুশিতে বাক-বাকুম কারণ সে আই পি এলে খেলে, সেই আমরাই ত্যক্ত বিরক্ত হই কেন এতগুলি খেলোয়াড় বেইমানি করে আই সি এলে গেল। কেউ কি ভেবে দেখেছেন আই পি এল আর আই সি এল এর তফাৎটা কী ? কোন তফাৎ নেই; শুধু আইপিএল ভারতীয় বোর্ডের তাই আইসিসি অনুমোদন দিয়েছে আর আইসিএল এর কপাল মন্দ তাই পায় নি।

অনেকের দেশপ্রেম যেই বর্গের সমানুপাতিক হারে উত্থিত হচ্ছে, ভয় হয়, কোনদিন না এইসব খেলোয়াড়দের মৃত্যুদন্ড দাবি করে বসে। কয়জন মানুষ ট্যাক্স দেয়, কয়জন মানুষ ঘুষ খায় না নিদেন পক্ষে কয়জন মানুষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে না ? শুধু ভাবতে হবে ক্রিকেটারদেরই।

কেউ কি একবার ভেবেছেন ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচকদের কি অবস্থা ? এত টাকার স্রোতের ভেতর তাঁরা কতটা ঠিক আছেন? কেন একজন সামরিক ব্যক্তি ক্রীড়া সংস্থা তথা ক্রিকেট বোর্ডের সাথে আছেন ? কেউ কি আছেন ? কেউ কি একটু বলবেন ?

এক রোববার দুপুরে রোদে পুড়তে পুড়তে বাসায় আসি। সেই রোববার রাতেই আকাশ ভেঙ্গে নামে বৃষ্টি। সাথে কিছুটা বিদ্যুত চমকায়, দুয়েকটা বাজ ও বুঝি পড়ে।

কেউ কেউ ভালোবেসে ফেলে প্রায় একযুগ আগে আর বর্তমানের জন্য রাখে শুধুই হাহাকার। তবু টিকে থাকা যায় কারণ মানুষ পৃথিবীতে এসেছে টিকে থাকার জন্যই। স্মৃতি থাকে না কিছুই , শুধু মাঝে মাঝে মোবাইলের রিংটোনটা হয়তো একটু জ্বালায়। তবু সেটা মেনে নেওয়া যায় কারণ মোবাইলের বহু আগেই আবিষ্কৃত হয়েছিলো প্রেম।

মানুষ ভুলে থাকতে চায়, কিন্তু হয়তো ভুলে থাকতে চায় না তার শরীর। বহু আগে ভুল করে সন্ধ্যা হই হই কোন এক বিকেলে যখন তারা জড়িয়ে ধরে ভীতভাবে প্রথম চুমু খেয়েছিলো, তার স্মৃতি কোথায় যেন একটা দগদগে ঘা রেখে যায়। কিন্তু আশ্চর্য, তবু মানুষ পারে। মানুষের মরে যেতে ইচ্ছে করে কিংবা আফসোস জাগে কেন জন্ম হলো, তবু মানুষ বেঁচে থাকে।

কাচের জানালায় একসময় সেই রোববারের বৃষ্টির ছাট এসে লাগে, ঝাপসা হয়ে যায় সামনের ভবিষ্যত। ছবির মত পরিষ্কার হয়ে উঠে একযুগ আগের সেই ভালোবাসার অতীত, যাদেরকে আমরা বাঁচিয়ে রাখি সযত্নে।

নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল [মূল গ্রন্থের প্রচ্ছদ]

নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল

কিছুদিন আগেই শেষ হলো ঐতিহ্য প্রকাশনীর মাসব্যাপী বাৎসরিক সেল, সেখান থেকেই কিনেছিলাম গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের “নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল” , যার অনুবাদ করেছেন অশোক দাশগুপ্ত। মার্কেজের শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা পড়েছিলাম জি এইচ হাবীবের অনুবাদে। প্রচন্ড বিরক্তিকর সেই অনুবাদ পড়ার পর থেকেই খুব সাবধানী হয়ে গিয়েছিলাম অনুবাদ পড়ার ক্ষেত্রে, বিশেষত মার্কেজের লেখার অনুবাদগুলি। কিন্তু সেই ভয় অনেকটাই দূর করে দিয়েছেন অনুবাদক , চমৎকার ঝরঝরে একটি অনুবাদ উপহার দিয়ে। মূলত তাঁর চমৎকার অনুবাদের কারণেই বইটি অনেকাংশে সুখপাঠ্য হয়েছে ( অবশ্যই সবার আগে প্রধান কৃতিত্ব মূল লেখকের ), এবং আমি বইটি নিয়ে দুটি কথা বলার সাহস যোগাতে পেরেছি।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ – নামটা শুনলেই যেন চোখের সামনে ভেসে উঠে দক্ষিন আমেরিকা, বিপ্লব, জাদু বাস্তবতা আর নিঃসঙ্গতা। জাদু-বাস্তবতা বাদে আর বাকি সবকটি উপাদান নিয়েই গড়ে উঠেছে “নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল” উপন্যাসিকা( Novella )টি। এই গল্পের পটভূমি হিসেবে মার্কেজ ব্যবহার করেছেন কলম্বিয়ার “লা ভায়োলেন্সিয়ার” দিনগুলিকে, যখন সেনাশাসন আর নানা ধরণের সেন্সরশিপ আরোপ করা হচ্ছে সমাজের সর্বত্র।

ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত অনুবাদের প্রচ্ছদ

ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত অনুবাদের প্রচ্ছদ

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন বৃদ্ধ কর্নেল, যিনি মাত্র বিশ বছর বয়েসেই কর্নেল উপাধি পেয়েছিলেন কর্নেল অরলিয়েনো বুয়েন্দিয়ার ০১ সাথে বিপ্লবে অংশ নিয়ে। কাহিনী মূলত এগিয়ে চলে বৃদ্ধ কর্নেল, তাঁর হাঁপানি আক্রান্ত স্ত্রী এবং তাঁদের দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের নানা অনুষঙ্গকে নিয়ে। কর্নেল প্রায় পনের বছর ধরে অপেক্ষা করে আছেন প্রতিশ্রুত পেনশন পাবার আশায়। প্রতি শুক্রবারই তিনি লঞ্চঘাটে যেয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন পেনশনের চিঠির অপেক্ষায়। সদ্যপ্রয়াত ছেলের রেখে যাওয়া মোরগটিকে তিনি সযত্নে লালন করেন মোরগ লড়াই এ অংশ নেওয়ানোর জন্য, নিজে অভুক্ত থাকেন শুধু মাত্র মোরগটিকে এক বেলা খাওয়ানোর জন্য।

এরকম বহুমাত্রিক টানাপোড়েনের সমান্তরালে লেখক নিখুঁত রেখায় একেঁছেন সমাজের চিত্র, আর ব্যক্তি কর্নেলের সার্বক্ষণিক লড়াই, নিজের সাথে নিজের। যিনি প্রতিনিয়ত অনুভব করেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে।কর্নেলের দারিদ্র্যটুকু বেশ প্রকটভাবেই ফুটে উঠে প্রথম লাইনে যখন লেখক বলেন,

……… একটি চাকুর সরু মাথা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কফির সর্বশেষ দানাটা পর্যন্ত কেতলির সাথে মেশালেন। কফি টিনের কিছু মরচের গুড়াও হয়তো তাতে মিশে গেল………

কিন্তু দারিদ্র্যের চরমতম কষাঘাতেও কর্নেল তার আভিজাত্যবোধ কিংবা আত্মাভিমানে বিন্দুমাত্র আঁচড় লাগতে দেননি। তাই উপন্যাসিকটা মূলত একজন বৃদ্ধ, নিঃসংগ পরাজিতের সৈনিকের মনঃস্তাত্বিক দ্বন্দ্বের কাহিনী। একদিকে যখন দিনে কীভাবে খাবার জোটাবেন সেই চিন্তা করেছেন, সেই একই লোকই আবার তার পোষা নধর কান্তি মোরগটি বিক্রি করেও, পরবর্তীতে মত পালটে অগ্রিম নেওয়া টাকাটুকু ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি সমস্ত উপন্যাসটিই কলম্বিয়ার তৎকালীন সময়ের চিত্রকে ধারণ করে। দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক শাসনাধীন, ধর্ম প্রভাবান্বিত এক সমাজকেই আমরা দেখতে পাই, যখন কর্নেলের ছেলেকে হত্যা করা হয় মোরগ লড়াই এর আসরে কিংবা গির্জার যাজক ঘন্টাধ্বণি বাজিয়ে সিনেমার সেন্সরশিপ ঘোষণা করেন এবং দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করেন কারা সেই সিনেমা দেখতে যাচ্ছে। এ উপন্যাসিকাতেই আমরা তৎকালীন কলম্বিয়াতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক কুটিল রূপ এর দেখা পাই , যখন কর্নেলের উকিল তাঁকে জানান যে, ফাইল এখন কোন দপ্তরে আটকা পড়ে আছে তা জানা প্রায় অসম্ভব এক ব্যাপার। এসব অনিয়মের সমান্তরলেই লেখক একেঁছেন সামন্ততান্ত্রিক সমাজের চিরায়ত রূপ। ‘শাবাস’ নামের যে লোক একসময় কর্নেলের গ্রামে এসেছিলো গলায় সাপ জড়িয়ে ঔষধ বিক্রি করতে, নানা রকম কারসাজিতে সেই বনে যায় সমাজের সবচেয়ে বড় মহাজন – লোক ঠকানোতে যিনি সিদ্ধহস্ত। তৎকালীন সমাজের অসঙ্গতি আর বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের প্রকট রূপের কথা জানতে পারি যখন গল্পের প্রথম ভাগেই লেখক জানান, বহুদিন পর সে গ্রামে একজন লোক সুস্থ-স্বাভাবিক নিয়মে মারা গিয়েছেন।

এত সব অনাচার, অবিচার আর হাহাকারের মধ্যেও টানটান হয়ে থাকে কর্নেলের আত্মাভিমান। এ কথা আমরা আরো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যখন কর্নেলের স্ত্রী বলেন,

………আমরা অনেক দিন চুলায় হাড়ি উঠাই নি। এটা প্রতিবেশিরা যাতে বুঝতে না পারে সে জন্য কত দিন আমি পাথর কুড়িয়ে হাড়িতে সিদ্ধ করেছি ………

প্রতিনিয়ত কর্নেলের মধ্যে দুটি বিপরীত সত্বা কাজ করেছে, একটি চেয়েছে মোরগটিকে বিক্রি করে নিজেদের উদরপূর্তি করতে, একই সাথে অপরটি চেয়েছে যেই ‘শাবাস’ নামক মহাজনের কাছে বিক্রি করবে, তার দেখা যেন আজকে না পাওয়া যায়। প্রচ্ছন্নভাবে বোঝা যায়, এত দারিদ্র্যের মধ্যেও কর্নেল স্বপ্ন দেখেছেন -  স্বপ্ন দেখেছেন তাঁর পেনশনের টাকা ফেরত পাবার কিংবা মোরগ লড়াইয়ে জিতে নিজের দিন বদলের , হয়তোবা নতুন কোন বিপ্লবেরও।  এই স্বপ্নের সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে যায়, যখন পোস্টমাস্টারের নিঃস্পৃহ কন্ঠে শোনা যায়ঃ

কর্নেল, নিশ্চিত করে মানুষের জীবনে যা আসে তার নাম মৃত্যু

সেই মৃত্যুকে নিশ্চিত জেনেও কর্নেল লড়াই করে চলেন মোরগটাকে বিক্রি না করার জন্য। উপন্যাসিকাটির শেষ তাই অনেক বেশি আকর্ষনীয়, যখন কর্নেল পচাত্তর বছরে দেনা-পাওনার হিসেব মিটিয়ে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে জীবনের মৌলিক সমস্যার সমাধান করেন।

এভাবেই লেখক বিস্তৃত ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন নিঃসঙ্গতাকে। দারিদ্র্য আর আত্মাভিমান সবকিছু ছাপিয়ে অন্তরালের নিঃসঙ্গতাই এ গল্পে মুখ্য হয়ে উঠে। গল্পের প্রতিটি ক্ষণ পাঠক, কর্নেলের চরিত্রের সাথে মিশে যান, অনুভব করেন সেই তীক্ষ্ণ জীবন যন্ত্রনা, শতবর্ষের বয়ে চলা নিরন্তর নিঃসঙ্গতাকে। আর এভাবেই নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল হয়ে উঠে একটি সার্থক মার্কেজীয় রচনা।

০১* কর্নেল অরলিয়েনো বুয়েন্দিয়া – মার্কেজ রচিত নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র। এই উপন্যাসের জন্য মার্কেজ সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন।

ছবি

গত ছয় সাত বছর ধরে ইন্টারনেট বাসের এই সময়টাতে যে জিনিশটা সবচেয়ে বেশি দেখেছি, তা হচ্ছে চমৎকার সব ছবি। প্রথম দিকের গুগল ইমেজ সার্চ, পরে ফ্লিকারের সন্ধান পাওয়ার পর বুঝতে পারলাম এই বিশাল জালের নানা কোণে অসাধারণ সব ছবি লুকিয়ে আছে, যাদের দেখলে বিস্ময়ে মুখ হা করে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। তবে এত চমৎকার সব ছবির মধ্যেও খুব কম ছবিই আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে, কিংবা ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়েছে। দুর্ভিক্ষের সেই অ্যাওয়ার্ড পাওয়া ছবি দেখেও সত্যিকার অর্থে ততোটা ধাক্কা খাইনি, যতটা ধাক্কা খেয়েছি আমি দুইটা ছবি দেখে।

প্রথম ছবি ভাষা শহীদ বরকতের মায়ের–

শহীদ মিনারের সামনে �াষা শহীদ বরকতের মা

শহীদ মিনারের সামনে ভাষা শহীদ বরকতের মা

ছবিটা দেখা মাত্র আমি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হই। হতবিহবল একজন বৃদ্ধা রমনী, যার ছেলে জীবন দিয়েছে ভাষার যুদ্ধে, তাঁর চোখে এক ধরণের নীরব অভিযোগ দেখতে পাই আমি। শুধু মনে হয়, এ ছবিটার দিকে তাকানোর সাহসটুকু আমার নেই, সাহস নেই এই বৃদ্ধা মায়ের চোখের দিকে তাকানোর। হয়তো বহুকাল আগেই মারা গিয়েছেন এই বৃদ্ধা, তবু মনের কোথায় যেন একটা খচখচে ভাব থাকে, একটা অস্বস্তি,  একটা ভয় দানা বেঁধে উঠতে থাকে, মনে হতে থাকে আমরা দল বেঁধে হত্যা করেছি তাঁর ছেলেকে।

আরেকটা হচ্ছে ফুলবাড়ী আন্দোলনের সময় তোলা একটা ছবি।

আন্দোলন শুনলেই মনে হয় বিএনপি না আওয়ামীলীগ ? বিশ্বাস করতে পারি না, শুধু মাত্র নিজের অস্তিত্বের জন্য কেউ আন্দোলন করতে পারে। মিছিলে লোক দেখলে মনে হয়, এদেরকে তো টাকা দিয়ে ভাড়া করা হয়েছে। রাজনীতির অধঃপতনের ( শুধুই কি রাজনীতি ? আমাদেরও কি অধঃপতন হয় নি ? ) এই যুগে আন্দোলন শব্দটার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছে।

সেই হারানো বিশ্বাসটাই যেন নতুন করে জন্ম নেয় ছবিটা দেখলে। অশিক্ষিত-দরিদ্র এইসব মানুষের ভয়হীন পদচারণা কোথায় যেন একটুখানি আশার প্রদীপ জ্বালায়, যে আলোতে আলোকিত হয়ে উঠে এই গ্রহের আদ্যোপান্ত।

কাটাকুটি -০২

মেলানকোলিঃ শিল্পী স্টেলা হোয়াইটের আঁকা

মেলানকোলিঃ শিল্পী স্টেলা হোয়াইটের আঁকা

মানুষের মন সত্যিই বিচিত্র। কখন কী কারণে যে মন ভালো কিংবা খারাপ হতে পারে সেটাও সমান বৈচিত্র্যের। গত দু-তিন দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাতে আমার মন ভালো থাকা উচিত না এবং আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত সেটা ছিলোও না। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে স্প্রেড স্পেক্ট্রামের উপর গতসপ্তাহে ল্যাবে করা আসা এক্সপেরিমেন্টের রিপোর্ট লেখতে যেয়ে একটা ব্যাপার খুব সহজেই ধরে ফেলার পর, মনে খুব ফূর্তি হল। বেশ ছোট একটা ব্যাপার, এজন্য মিনিট পাঁচেকের জন্য মন ভালো হতে পারে কিন্তু ফূর্তি ফূর্তি বোধ হওয়ার কথা না। তবু বেশ আনন্দ পাচ্ছি। যে রিপোর্টটা নিশ্চিন্তে ল্যাব পার্টনারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারতাম, সেটা নিজেই বসে বসে লিখছি।

কেন এরকম করছি ? একটু আগে বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বুঝলাম, আমি আসলে পালাতে চাইছি। নিজের থেকে নিজেই পালাতে চাইছি। যে চিন্তাগুলি করতে ভালো লাগে না সেগুলি থেকে পালাতে চাইছি ; আর তাই আনন্দ খুঁজে পাচ্ছি কমিউনিকেশন থিয়োরির কোন সমস্যার সামান্য কোডিং এ। যাক, আনন্দ যখন পাচ্ছি সেটাই সই। নিজেকে নিরানন্দে রাখতে এই মূহুর্তে আর ইচ্ছা করছে না।

## একটা গল্প লেখার ইচ্ছা মাথায় খুব ঘুরঘুর করছে গতকয়েকটা দিন ধরে। আগামীকাল কোন কাজ না থাকলে, একটা প্লট ভাবতে হবে।

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.